আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বড় রকমের পরিবর্তন আসছে

দৈনিক স্বরবর্ণ
সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২১ ৪:৩২ অপরাহ্ণ
পঠিত: 109 বার
Link Copied!

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দেশের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বড় রকমের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রাক্‌–প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিদ্যমান পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (শিখনকালীন) বেশি হবে। এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা হবে না, পুরোটাই মূল্যায়ন হবে সারা বছর ধরে চলা বিভিন্ন রকমের শিখন কার্যক্রমের ভিত্তিতে। পরবর্তী শ্রেণিগুলোর মূল্যায়নের পদ্ধতি হিসেবে পরীক্ষা ও ধারাবাহিক শিখন কার্যক্রম—দুটোই থাকছে।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে, সে জন্য ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছিল সরকার। যদিও শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করাসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার; বরং শিক্ষানীতি এবং বিদ্যমান শিক্ষাক্রমে না থাকার পরেও বর্তমানে জাতীয়ভাবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। আবার শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এক দশক পেরিয়ে গেলেও শিক্ষা আইনটি করা যায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে শুধু আইনের খসড়া নিয়েই আলোচনা চলছে। অবশ্য এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন শিক্ষাক্রম হচ্ছে।

বাস্তবায়ন হবে যখন

এনসিটিবির সূত্রমতে, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী বছর থেকে প্রথম শ্রেণি ও ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য নির্ধারিত কিছুসংখ্যক  শিক্ষাক্রম পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) চালু করা হবে। বিভিন্ন শ্রেণিতে তা পর্যায়ক্রমে চালু হবে পরের বছর থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি; ২০২৪ সালে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণি; ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে চালু হবে নতুন শিক্ষাক্রম। এরপর উচ্চমাধ্যমিকের একাদশ শ্রেণিতে ২০২৬ সালে এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে ২০২৭ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে।

নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান গতকাল বলেন, এখন পরীক্ষামূলকভাবে চালুর জন্য মাধ্যমিকের ১০০টি এবং প্রাথমিক স্তরের ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্রুত নির্ধারণ করা হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এগুলো নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে বই তৈরি, প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে আগামী বছরের জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করা হবে। পাশাপাশি এ–সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যক্রমও চলতে থাকবে।

যেভাবে হবে মূল্যায়ন

শিক্ষাক্রমের রূপরেখা অনুযায়ী, প্রাক্-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে কোনো পরীক্ষা থাকবে না। এসব শ্রেণিতে শতভাগ মূল্যায়ন হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখনকালীন ধারাবাহিকতার ওপর।

ধারাবাহিক শিখন কার্যক্রমের ভিত্তিতে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের ৬০ শতাংশ মূল্যায়ন হবে। বাকি ৪০ শতাংশ মূল্যায়ন হবে পরীক্ষার ভিত্তিতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখনকালীন কার্যক্রমের ভিত্তিতে এই দুই শ্রেণির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্পকলা বিষয়ের পুরোটাই মূল্যায়ন হবে।

ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে ৬০ শতাংশ মূল্যায়ন হবে শিখনকালীন। এর বাইরে আরও পাঁচটি বিষয়ের শতভাগ মূল্যায়ন হবে ধারাবাহিক শিখন কার্যক্রমের ভিত্তিতে। বিষয়গুলো হলো: জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। নবম ও শ্রেণিতেও এই পাঁচটি বিষয়ে একইভাবে মূল্যায়ন হবে। এর বাইরে এই দুই শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে ৫০ শতাংশ মূল্যায়ন হবে শিখনকালীন। বাকি মূল্যায়ন হবে পরীক্ষার মাধ্যমে।

একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে গিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়নে বেশি জোর দেওয়া হবে। এই স্তরে ৭০ শতাংশ মূল্যায়ন হবে পরীক্ষার মাধ্যমে এবং বাকি ৩০ শতাংশের মূল্যায়ন হবে শিখনকালীন।

শিখনকালীন কীভাবে ধারাবাহিক মূল্যায়নটি হবে জানতে চাইলে এনসিটিবি সদস্য মো. মশিউজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কতটা দক্ষ হয়ে উঠছে, সেটা তাদের উপস্থাপনার (প্রেজেন্টেশন) মাধ্যমে যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া অ্যাসাইনমেন্টসহ বছরব্যাপী বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে এই মূল্যায়ন করবেন শিক্ষকেরা। এর মাধ্যমে মূলত শিক্ষার্থীকে যোগ্য করে তোলা হবে।

নতুন শিক্ষাক্রমে দশম শ্রেণির আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা রাখা হয়নি। বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণি শেষে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা এবং অষ্টম শ্রেণি শেষে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা হয়। সরকার এটিকে সরাসরি পাবলিক পরীক্ষা বলে না। জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা বলে থাকে। কিন্তু পরীক্ষার আয়োজনটি হয় পাবলিক পরীক্ষার মতো করে। এই পরীক্ষার ভিত্তিতে সনদও দেওয়া হয়। ফলে অনেকে ধরে নিয়েছেন, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়িত হলে হয়তো সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষা হবে না। কিন্তু বিষয়টি সরকার এখনো পরিষ্কার করে বলছে না।

এ বিষয়ে এনসিটিবির একজন সদস্য বলেন, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী এবং জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা হচ্ছে সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আলোকে। এখন এই পরীক্ষা থাকবে কি না, সেটি সরকার সিদ্ধান্তের বিষয়।
দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন পড়াশোনা

এখন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সবাইকে অভিন্ন বিষয় পড়তে হয়। আরেকজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, মানবিক নাকি ব্যবসায় শিক্ষায় পড়বে, সেটি বর্তমানে ঠিক হয় নবম শ্রেণিতে গিয়ে। নতুন শিক্ষাক্রমে এই বিভাজন হবে একেবারে উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে। অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে ১০টি অভিন্ন বিষয়ে পড়ানো হবে। এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, একুশ শতকের এই সময়ে একটি স্তর পর্যন্ত সবাইকে দক্ষ করে তোলার উদ্দেশ্যে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সবাইকে অভিন্ন বিষয় পড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত দেশে এমন ব্যবস্থা ছিল।

নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১০ ধরনের শেখার ক্ষেত্র ঠিক করা হয়েছে। এগুলো হলো ভাষা ও যোগাযোগ, গণিত ও যুক্তি, জীবন ও জীবিকা, সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব, পরিবেশ ও জলবায়ু, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। প্রাক্‌-প্রাথমিকের শিশুদের জন্য আলাদা বই থাকবে না, শিক্ষকেরাই শেখাবেন।

নবম ও দশম শ্রেণিতে জীবন ও জীবিকা বিষয়ে বাধ্যতামূলকভাবে প্রত্যেক শিক্ষার্থী কৃষি, সেবা বা শিল্প খাতের একটি পেশায় দক্ষতা অর্জন করবে। আর দশম শ্রেণি শেষে যেকোনো একটি পেশায় কাজ করার মতো পেশাদারি দক্ষতা অর্জন করবে শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে মাধ্যমিকে ১২ থেকে ১৪টি বই পড়ানো হয়। নতুন শিক্ষাক্রমে এই স্তরে বইয়ের সংখ্যা হবে ১০।
নতুন শিক্ষাক্রমের বিবেচ্য বিষয়

এর আগে ২০১২ সালে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকের শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করা হয়েছিল, যা এখন চলছে। নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা অর্জনের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এ জন্য এই শিক্ষাক্রমকে বলা হচ্ছে যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম। কিছু বিষয় মাথায় রেখে এই শিক্ষাক্রম তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো হলো আনন্দময় পড়াশোনার পরিবেশ সৃষ্টি, মুখস্থ নির্ভরতার পরিবর্তে অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রমভিত্তিক শিখনে অগ্রাধিকার, বিষয় ও পাঠ্যপুস্তকের বোঝা ও চাপ কমানো, গভীর শিখনের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া, দৈহিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা ও সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি, সনদ পাওয়ার চেয়ে পারদর্শিতা অর্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ এবং জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত শিক্ষা অর্জন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।