আজকের সর্বশেষ সবখবর

সাংবাদিকতাকে ভয় দেখানোর বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের এখন ঐক্য জরুরি

দৈনিক স্বরবর্ণ
সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২১ ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ
পঠিত: 127 বার
Link Copied!

গণতন্ত্রের অব্যাহত ক্ষয়সাধন রোধে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতার পটভূমিতে মুক্ত সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকা যখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তখন আরও বেশি হতাশার কারণ হয়েছে সাংবাদিকদের অনৈক্য। বলা যায়, রাজনৈতিক বিভাজনের ধারায় সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর বিভক্তিতে লাভবান হয়েছে সরকার। একদিকে টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার-সমর্থকদের আধিক্য এবং অন্যদিকে সাংবাদিক ইউনিয়নের দলীয়করণ গণমাধ্যমের স্বাধীন ও সুস্থ বিকাশ অনেকটাই রুদ্ধ করে ফেলেছে। এ রকম পটভূমিতে সাংবাদিক নেতাদের ব্যাংক হিসাব তলব করার পদক্ষেপ অনেককেই বিস্মিত করেছে। ইউনিয়নগুলো এই অস্বাভাবিক পদক্ষেপকে ‘স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা’ হিসেবেই বিবেচনা করছে। বোঝা যাচ্ছে সরকার স্বস্তিতে নেই। এই পদক্ষেপ সরকারের অস্বস্তি ও অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হচ্ছে, এই অস্থিরতা কেন এবং সাংবাদিক নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রভাব কী হতে পারে।

শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো, ইউনিয়নগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেও সাংবাদিক নেতারা ব্যাংকগুলোর কাছে তাঁদের হিসাব তলবের বিষয়ে বেশ জোরালোভাবেই বলেছেন যে তাঁরা চান বিষয়টি নিয়ে যেন কোনো রহস্য তৈরির চেষ্টা না হয় এবং সে কারণে হিসাবগুলো যেন প্রকাশ করা হয়। এই বক্তব্য ও উদারতার জন্য তাঁদের প্রশংসাই প্রাপ্য। কেননা, রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ীদের বেলায় কোনো কোনো সময় আমরা দেখে অভ্যস্ত যে এ ধরনের পদক্ষেপ, বিশেষ করে যদি তা দুর্নীতি দমন কমিশনের নোটিশ হয়, তাহলে তাঁরা ওই নোটিশ স্থগিত করার জন্য হয় তদবির, নয়তো দ্রুতগতিতে আদালতের দ্বারস্থ হন। সেটা তাঁদের অধিকার এবং তাঁদের সমালোচনা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা শুধু সাংবাদিক নেতাদের দৃশ্যমান নৈতিক অবস্থানের তারিফ করি। এঁদের মধ্যেও যদি কেউ অপ্রকাশ্য তদবিরে নেমে পড়েন, তাহলে তাঁরও সমান সমালোচনা প্রাপ্য হবে।

এখানে আরও একটি কথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে সাংবাদিকেরা এই সমাজেরই অংশ, কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা নন এবং ফেরেশতাও নন। কিছু কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যে অন্যায় এবং অসাধু উপায়ে অর্থ-সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে, সে কথা অস্বীকার করা যাবে না। দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে এঁদের কেউ কেউ যে টিভির লাইসেন্স, পত্রিকা, অনলাইন, আইপিটিভির অনুমতি নিয়ে অল্প দিনেই মিডিয়া হাউসের মালিক হয়েছেন, এমন নজিরও আছে।

টক শোতে এঁদের অন্ধ দলীয় আনুগত্যপূর্ণ বক্তব্য-বিশ্লেষণে বিরক্ত দর্শকেরা অনেকেই টিভি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, গণমাধ্যম আস্থার সংকটে পড়েছে। সরকারের সংস্থা, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এ রকম কারও ব্যাংক হিসাব তলব করলে তাতে বরং সাধুবাদ পেতে পারত। কিন্তু তারা সেই পথে হাঁটেনি। বরং সাংবাদিক ইউনিয়ন ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নির্বাচিত নেতাদের দোষ-ত্রুটির সন্ধানে জাল ফেলেছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এ রকম কিছু হলে আমাদের কিছু বলার ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, জাতীয় প্রেসক্লাব এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি-সম্পাদকদের বিরুদ্ধে একই সময়ে একই পদক্ষেপ প্রমাণ করছে যে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। এঁরা সবাই মিলেমিশে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে অন্যায় উপার্জন করতে পারেন, সেই যুক্তিও হাস্যকর, কেননা তাঁদের রাজনৈতিক বিরোধ মিটে যাওয়ার কোনো আলামতই মেলে না।

আমরা জানি, কিছুদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেই রাজনীতিকেরা ক্রমেই ক্ষমতাহীন হয়ে পড়তে থাকায় এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও অপরাধ মোকাবিলায় সরকার যে শূন্য সহনশীলতা বা জিরো টলারেন্সের কথা বলত, সেগুলোর সবই প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ায় চাপা ক্ষোভ ও সমালোচনা একটু একটু করে প্রকাশ পাচ্ছে। এখন তাই সরকারের সমালোচনার প্রতি জিরো টলারেন্সের ঘোষণা শোনা যাচ্ছে। কিছুদিন ধরে মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনাকে ‘অপপ্রচার’ অভিহিত করে তার বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করেছেন। এখন পুলিশপ্রধানও তাঁর বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, ‘কেউ যেন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশবিরোধী ও সরকারবিরোধী প্রচারণা’ চালাতে না পারে। দেশবিরোধী প্রচার কী, তার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তা বন্ধের কথা তিনি বলতেই পারেন। কিন্তু সরকারবিরোধী প্রচার বন্ধের নির্দেশনা কি তিনি দিতে পারেন? বিরোধী দলগুলো কি তাহলে বিলুপ্ত করে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেবে? নাকি রাজনীতি ছেড়ে দেবে? পুলিশপ্রধানের এই বক্তব্যকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার অবকাশ কোথায়?

দেশে গণতন্ত্রের যে গুরুতর ক্ষয়সাধন ঘটেছে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার লক্ষণীয় সংকোচন। এ জন্য যেসব পদক্ষেপ আমরা দেখেছি সেগুলোর মধ্যে আছে গণমাধ্যমের লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ, সংবাদমাধ্যমে অঘোষিত সেন্সরশিপ, গ্রেপ্তার, অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা এবং নিবর্তনমূলক ফৌজদারি আইনের অপব্যবহার-যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আইনটি হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।

প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আইনটি হওয়ার পর মাত্র দুই বছরে এই আইনে মামলার সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যার মানে দাঁড়াচ্ছে, দেশে গড়ে দিনে তিনটি করে মামলা হয়েছে এই আইনে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর গত মে মাসের হিসাব বলছে, করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে কমপক্ষে ৮০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। আর পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ২ জন সাংবাদিক, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭০ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন আরও অন্তত ৩০ জন এবং সাময়িকভাবে গুমের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৫ জন।

 

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।