ঢাকাসোমবার, ৩রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ৭:৪২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

প্রজন্মের ভালোবাসায় বেঁচে থাকবেন সুকুমার বাউলিয়া

দৈনিক স্বরবর্ণ
সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২১ ৫:৫০ অপরাহ্ণ
পঠিত: 168 বার
Link Copied!

কৃতজ্ঞতার বোধ জীবনের কাছেই থাকে। কিন্তু প্রতিকূলতায় প্রতিনিয়ত বিপন্ন জীবনে বর্তমানই একমাত্র সত্যি। নিয়ম ভেঙে হঠাৎ দু-একজন মানুষ চমকে দেন আমাদের। মুদ্রার আরেকটি পাশ দেখতে জানেন তাঁরা, অন্যকেও দেখতে শেখান। উপকূলীয় অঞ্চলের সুন্দরবনঘেঁষা কয়রার সুকুমার বাউলিয়ার একহারা গড়ন। রোদে পুড়ে তামাটে হওয়া রং দেখে বোঝার উপায় নেই কেমন ছিলেন একসময়। ভারী চশমা চোখের মানুষটির পোশাকও সাদাসিধে। উত্তর বেদকাশীর ১ নম্বর থেকে ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাজতখালীতে রোজ দুই বেলা আসেন সুকুমার। পায়ে হাঁটা পথটুকু আম্পানের পর থেকে কপোতাক্ষ নদের দখলে। তাই নৌকা সহায়। হাজতখালীতে নৌকা থেকে নেমে এদিক–সেদিক দেখতে দেখতে মিনিট পনেরো এগোলেই মুখোমুখি সুন্দরবন।

কপোতাক্ষের পরই গোলপাতার ঝাড় দিয়ে শুরু বনের প্রাচীর। এই কপোতাক্ষজুড়ে যেমন আছে ভাঙন আর হারানোর গল্প, তেমনি আছে জীবনের বিপুল আয়োজনের ব্যতিক্রম হয়ে থাকা দু-একটা জয়মাল্য ফুল। তবে এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা নগরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই হারিয়ে যায়। ঝড়–জলোচ্ছ্বাসে বারবার ঠিকানা বদলের ধারাবাহিকতায় উপকূলের মানুষও নিজ ভূমিতে থিতু হওয়ার সুযোগ পায় কম।
এ বয়সেও আগুন রোদে নদীপথে দিনে দুবার না এসে একবার দীর্ঘ সময় থাকলেই তো পারেন, জিজ্ঞেস করেছিলাম। সুকুমার বাউলিয়া লম্বা-চওড়া হাসি দিয়ে বললেন, একটা বেলা ছেলেপেলেগুলো তখন নাটাই ছাড়া ঘুড়ির মতো ভোঁ ভোঁ করে ঘোরে। বনের দিকের নদীতে যায়, না হলে রোদের ভেতরই জালসি (হাতে ঠেলা ছোট জাল) নিয়ে নামে। ভাটার টানে কাদায় আটকে পড়া গুলি, মেনু মাছ ধরতে ছোটে। তখন নিজেরাই এক–একটা কাদামাখা ভূত হয়ে ঘুর ঘুর করে। ওই বেলার লেখাপড়া তখন লবডঙ্কা। না আসলে হয় বলেন?

সত্যি হয় না। এমন মানুষ না এলে একটি নোনা ভূমির বিষণ্নতা আর হারানোর যন্ত্রণার ভেতর মুদ্রার ভিন্ন পাশের গল্প লেখা হয় না। শুধু প্রজন্মের পর প্রজন্ম নয়, প্রত্যন্ত একটি জনপদই বিরানভূমি থেকে যেতে পারে একজন সুকুমার বাউলিয়ার অভাবে। কয়রার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে পল্লী বিদ্যুতের বাতি পৌঁছেছে মাত্র বছর কয়েক আগে। খুলনার দৌলতপুরের সুকুমার চার যুগ আগে ভূমিপুত্র হয়ে আসেননি কয়রায়। জীবনের অভিঘাত টেনে এনে আশ্রয় দিয়েছে। তখনো এই জনপদ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় আবার ভেসে ওঠে। কখনো কখনো মরদেহ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া গতি নেই আপনজনের। শ্বাপদসংকুল প্রান্তরের মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের মাপে স্মৃতির মূল্য অমূল্য হয় না কখনো। সেই জনপদে তিনি আশ্রয় খুঁজে নিলেন। আর মানুষ দেখল, হঠাৎ আসা মানুষটা আসলে নিজেই আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠলেন বহুজনের জন্য। এসএসসি পাস সুকুমার দেখলেন, এখানকার শিশুরাও পূর্বসূরির অনুগামী। নদী, নৌকা, বনের বিকল্প ভাবতে শেখেনি। ছোট শিশুদের অক্ষরজ্ঞানের চেয়ে বেশি আগ্রহ, গোলপাতার ফল দেখা বা জোয়ার–ভাটার পূর্বাভাস দিতে পারায়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দূরের আর সেখানে নিয়মকানুনের জন্যও বনজীবী, জঙ্গল করা মানুষের সন্তানদের পাঠানোর আগ্রহ কম। তিনি সেই শিশুদের জন্য ১৯৭৮ সালে একার উদ্যোগে শুরু করলেন যাত্রা।

বাদাবন থেকে আনা গোলপাতা বিছিয়ে বসো, মাটিতে দাগ দিয়ে শেখো স্বরবর্ণ। শুরু হলো শেখানোর নেশা। কিন্তু একার প্রচেষ্টায় কতটুকু সম্ভব! নদী থেকে তুলে আনেন, বনের ধার থেকে ধরে আনেন, খেলার মাঠ থেকে কান ধরে টেনে এনে বসান নব ধারাপাতের সামনে। তখন থেকেই হাজতখালী শিশুশিক্ষা নিকেতন প্রাক্‌ প্রাইমারিকে সবাই বলে ‘পাঠশালা’। তিনটি শ্রেণির পাঠদান করেন একমাত্র শিক্ষক। বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজির পাশাপাশি প্রতিদিন সময় নিয়ে শেখানো হয় নীতিকথা ও সমাজবিজ্ঞান। খুদে শিক্ষার্থীরা মাস্টারমশাইকে ভয় পেতে পেতে ভালোবাসতে শেখে। তাদের অভাবী অভিভাবক এই শিক্ষকের কাছে যখন-তখন আসেন নানা সমস্যা নিয়ে। মন দিয়ে শোনেন, সমাধান দেন। মাঝেমধ্যে নিজেও ডাকেন। নদীতে মাছ ধরা নারী, বন থেকে মধু সংগ্রহ করা পিতা সন্তানের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবক হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন। অজান্তে এভাবেই বাড়ে মানুষের নিজের প্রতি নিজের সম্মান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই মানুষেরা এত দিন জানত, তারা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সংবাদ শিরোনাম। ত্রাণের জন্য পানির ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। একজন মানুষ ধীরে ধীরে বদলে দিতে শুরু করল তাদের মানসিকতা। শিশুদের মনস্তত্ত্ব খুব শক্তিশালী। তারা মা–বাবার সম্মান–অসম্মানটা খুব বোঝে। তাই পড়তে বিশেষ ইচ্ছা না থাকলেও মাস্টারমশাইকে ওরা ঠিক ভালোবাসে। এতটাই অধিকার যে এ শিক্ষকের একার একটা ছবি তোলারও যেন অধিকার নেই।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।