ঢাকাসোমবার, ৩রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ৭:১৪
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নিজ দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবারের মতো কারণ দর্শানোর নোটিশ পেলেন: গাজীপুর সিটির মেয়র, জাহাঙ্গীর আলম

জয়িতা দাস
অক্টোবর ৯, ২০২১ ১২:২৫ অপরাহ্ণ
পঠিত: 192 বার
Link Copied!

স্কুল থেকে কলেজ ছাত্রলীগের নেতা। সেখান থেকে জেলা ও কেন্দ্রে। এরপর গাজীপুরের সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে গাজীপুর সিটির মেয়র, তিনি জাহাঙ্গীর আলম। নিজ দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবারের মতো কারণ দর্শানোর নোটিশ পেলেন। সামাজিক যোগাযোগর মাধ্যমে ছড়ানো এক ভিডিওয়ের রেশ ধরে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে এই ব্যবস্থা। ১৮ অক্টোবরের মধ্যে দিতে হবে জবাব।

ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার বিশেষ স্নেহের পাত্র, গাজীপুরের দাপুটে নেতা জাহাঙ্গীর এবার দলীয় রাজনীতিতে চাপে পড়লেন বলেই মনে করছেন স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় কোনো নেতা। অবশ্য জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘জীবনে প্রথম দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এল। এমন কখনোই হয়নি।

অডিও-ভিডিওর আগে-পরে কী আছে, তার হদিস নেই। এভাবে কেটে কেটে ষড়যন্ত্রমূলভাবে এসব ছড়ানো হয়েছে। এটা যে মিথ্যা, তা শোকজের জবাবে তুলে ধরব। ভয় পাই না। কিন্তু মন খারাপ হয়েছে।’ তাঁর দাবি অডিওর কথোপকথন সুপার এডিটেড।

গাজীপুরে দীর্ঘদিন ধরেই মেয়র জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে একটি ক্ষোভ দানা বাঁধছিল। অডিও–ভিডিও সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটল বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের ধারণা। ত্রিধাবিভক্ত গাজীপুর আওয়ামী লীগ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। গাজীপুরের আওয়ামী লীগে একসময়ের জাহাঙ্গীরের সুহৃদেরাও এখন তাঁর বিরুদ্ধে। এর পাশাপাশি জাহাঙ্গীরের ভাষায় দলের ‘বিরুদ্ধবাদীরা’তো আছেনই। বড় একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা এবং তাঁদের অনুসারীরা এবার জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে এককাট্টা।

মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের গোপনে ধারণ করা একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জেলার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছে বলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন।

এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে গাজীপুরের রাজনীতি উত্তপ্ত। এ নিয়ে গাজীপুরে মেয়র-সমর্থকদের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। ৩ অক্টোবর দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জাহাঙ্গীর আলমকে কারণ দর্শানোর এ নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতি তপ্ত।

যদিও গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগে সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘সমস্যা একটা হয়েছে। কিন্তু নেত্রী (দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) এসেছেন (যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে)। এখন মিটে যাবে।’

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ৫৭ ধারায় প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার বিষয়ে বলা আছে। সেখানে বলা আছে, যেকোনো সদস্য আওয়ামী লীগের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, নিয়মাবলি, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পরিপন্থী কাজে অংশ নিলে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ তাঁর বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে।
গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান প্রথম আলোকে বলেন, জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করেছে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটি। সেখানে বলা হয়েছে, তাঁর কর্মকাণ্ড দলের স্বার্থবিরোধী। তাঁর কাছে শুধু জবাব নয়, ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে। তাঁর সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ চেতনার জায়গা থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং করেছে।

আজমত উল্লা খানের ভাষায়, তাঁর সঙ্গে জাহাঙ্গীরের সুসম্পর্ক বজায় আছে।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মহানগর আওয়ামী লীগে চরম অস্থিরতা চলছে। সভা ও পাল্টা সভা, মিছিল এখন প্রতিদিনের চিত্র। ২৪ সেপ্টেম্বর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজের শক্তির জানান দিতে জাহাঙ্গীর আলম বোর্ড বাজারে সভা করলেন। মহানগর আওয়ামী লীগ ৫৭ সদস্যবিশিষ্ট। সেখানে একজন সহসভাপতিসহ মাত্র সাত নেতা উপস্থিত ছিলেন। আবার ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে মহানগর আওয়ামী লীগ বিশাল সভা করে টঙ্গী সরকারি কলেজ মাঠে। সেখানে আজমত উল্লা সভা করলেন। অনুপস্থিত জাহাঙ্গীর বিকেলে দলীয় কার্যালয়ে মহিলা আওয়ামী লীগের আয়োজনে সভায় যোগ দেন।

আজমত উল্লার সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমের বিরোধ নতুন নয়। এর সঙ্গে আরেকজনের নাম উল্লেখ করতেই হয়। তিনি সদরের সাংসদ ও যুব ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল।

গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রবীণ নেতার কথা, আজমত-জাহাঙ্গীর-রাসেলে বিভক্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ এখন জাহাঙ্গীর বনাম জাহাঙ্গীর বিরোধীতে রূপ নিয়েছে। গাজীপুরকে বলা হয় আওয়ামী লীগের ‘দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ’। এই বিভক্তি দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন সামাল না দিলে ভবিষ্যতে আরও জটিল হবে পরিস্থিতি।

গাজীপুরকে যে দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ বলা হলো তা এমনিতে নয়। সেই ১৯৯১ সাল থেকে গাজীপুর কখনো আওয়ামী লীগকে শূন্য হাতে ফেরায়নি। ১৯৯১–এর সংসদ নির্বাচনে দুটি আসন পায় আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬–এর সংসদে জেলার চারটি আসনই পায় আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের সেই সময়েও আওয়ামী লীগ তিনটি আসন পায় শহীদ তাজউদ্দিনের স্মৃতিবিজড়িত এ জেলায়। একটি আসনে বিএনপির ফজলুল হক মিলন জেতেন মাত্র ৩৮৫ ভোটে।

প্রয়াত ময়েজউদ্দীন, রহমত আলী, আহসান উল্লাহ মাস্টার এবং এখনকার মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, আজমত উল্লা খান, আখতারুজ্জামান—এঁরা সবাই এ জেলার আওয়ামী দুর্গ পাহারা দিয়েছেন সাহসিকতার সঙ্গে। যেকোনো গণ–আন্দোলনে ঢাকার কাছের শ্রমিক অঞ্চল গাজীপুরের টঙ্গীর শ্রমিকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন আহসান উল্লাহ মাস্টার। সাহসী এ নেতাকে ২০০৪ সালের মে মাসে প্রকাশ্যে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তাঁর ছেলে এখনকার যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খানকে বলা হতো ‘চেয়ারম্যানদের চেয়ারম্যান।’

দীর্ঘকাল ধরে তিনি টঙ্গী পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই সঙ্গে ছিলেন চেয়ারম্যানদের সমিতির প্রধান। ডাকসাইটে এসব প্রবীণের মধ্যে জাহাঙ্গীর উঠে আসেন। গড়ে তোলেন নিজস্ব বলয়। পোশাকশিল্পের উপজাত ঝুটের ব্যবসায় করে বিপুল অর্থের মালিক জাহাঙ্গীর। নিজের নামে একটি ফাউন্ডেশন করে সমান্তরাল একটি শক্তি সৃষ্টি করেন। তাঁর দেওয়া আর্থিকসুবিধা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাও পান বলে বলা হয়। এমন অবস্থায় বর্ষীয়ান আজমত উল্লার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটির প্রথম নির্বাচনের সময়। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের রূপকার ছিলেন আজমত উল্লা।

সে বছরে প্রথমবার সিটির নির্বাচন হয়। প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। কিন্তু পারেননি। দল বেছে নেয় টঙ্গী পৌরসভার দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খানকে। নির্বাচনে আজমত উল্লা হেরে যান। নির্বাচনে জাহাঙ্গীরের ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ ভূমিকা নিয়ে দল তখনো প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী লীগে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এ সময় জাহিদ হাসান রাসেল ছিলেন জাহাঙ্গীরের পক্ষে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নির্বাচন-পরবর্তী এক মূল্যায়ন এমন ছিল, জাহিদ আহসান রাসেল ও জাহাঙ্গীর আন্তরিক হলে সিটি নির্বাচনের ফল ভিন্ন হতে পারত।

সেই নির্বাচনের ফলাফল যে মনে কষ্ট দিয়েছে, তা জানান আজমত উল্লা খান। তিনি বলেন, ‘কারও নাম উল্লেখ করব না। কিন্তু বিরোধিতা ছিল। সেটা কষ্টও দেয়। আমি মনে করি, আমরা যাঁরা দল করি, দলের প্রতি আনুগত্য থাকা উচিত।’

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।